
পারসিমন : শরতের কমলা গ্রহ
— শাহাদাতুর রহমান সোহেল
শরতের আকাশ থেকে ঝুলে আছে কমলা গ্রহ,
পাতার আড়ালে কে যেন জ্বালিয়েছে নীরব সূর্য;
জাপানের গ্রামপথে কাকি ফলের ভারে নুয়ে ডাল,
মনে হয়, পৃথিবী আজ ফলের ভেতর লিখছে তার আয়ু।
বসন্তে ফুলের জন্ম, গ্রীষ্মে সবুজ শরীর,
দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে শরৎ খুলে দেয় মধুর দ্বার;
পারসিমনের গোল বুকে জমে থাকে রোদের ইতিহাস,
একটি ফলের ভেতর যেন ঋতুচক্রের ক্ষুদ্র সংসার।
অপরিপক্ব ঠোঁটে তার ট্যানিনের কষা অন্ধকার,
জিহ্বায় রেখে যায় অসমাপ্ত স্বাদের কঠিন সংকেত;
পাকলে কোনো কোনো জাত নরম মধুর মতো গলে,
তিক্ততারও একদিন ফুরিয়ে আসে নিজস্ব আধিপত্য।
কোনোটি আপেলের মতো দৃঢ়, কোনোটি মেঘের মতো নরম,
জাতভেদে বদলে যায় স্বাদ, গঠন, পাকার রীতি;
বীজহীন কমলা চাঁদে সূর্যের রঙিন স্বাক্ষর,
বিটা-ক্যারোটিনে তার রঙ পায় উজ্জ্বল দীপ্তি।
জাপানের উঠোনে ফল ঝোলে শেষ বিকেলের প্রদীপ হয়ে,
খোসা ছাড়ানো পারসিমন সার বেঁধে শুকোয় শীতের আগে;
হোশিগাকি—রোদ, বাতাস আর ধৈর্যের পুরোনো কারুকাজ,
মিষ্টতা ঘনীভূত হয় সময়ের ধীর পরিচর্যায়।
চীন থেকে জাপান—কোরিয়ার শরৎমাখা প্রান্তর,
কমলা ফলের ভাষা বহন করে বহু দিনের কৃষিস্মৃতি;
মানুষ শুধু ফল ফলায় না—সংরক্ষণ করে ঋতুকেও,
শীতের দীর্ঘ নীরবতায় পৌঁছে দেয় শরতের প্রীতি।
হে পারসিমন, তুমি কি সূর্যের গোপন কোনো বীজ,
নাকি সময়ের হাতে পাকতে থাকা কমলা পৃথিবী?
তোমার মিষ্টি মাংসে ঋতুর শরীর খুঁজে পাই,
তোমার কষা স্বাদে টের পাই—সব পরিপক্বতা তাৎক্ষণিক নয়।
একদিন ডাল শূন্য হবে, ঝরে পড়বে শেষ পাতা,
তবু শুকনো ফলের ভেতর রয়ে যাবে রোদের স্মৃতি;
শরৎ চলে যায়—কিন্তু তার কমলা উত্তরাধিকার
মানুষের শীতের থালায় রেখে যায় পৃথিবীর উষ্ণতা।
তথ্য-টীকা: পারসিমনের জাপানি নাম ‘কাকি’ । কিছু জাত কষযুক্ত অবস্থায় থাকে; পাকার ধরন ও কষ দূর হওয়ার প্রক্রিয়া জাতভেদে আলাদা। জাপানের ঐতিহ্যবাহী শুকনো পারসিমন ‘হোশিগাকি’ তৈরিতে খোসা ছাড়িয়ে ফল শুকানো হয়।
No comments:
Post a Comment