পরাবাস্তব কবিতা: পারসিমন : কমলা অমাবস্যা - শাহাদাতুর রহমান সোহেল


পারসিমন : কমলা অমাবস্যা
- শাহাদাতুর রহমান সোহেল

আকাশে আজ ফলের মতো ঝুলে আছে একটি কমলা গ্রহ,
তার শিকড়ে ঘুমিয়ে আছে নির্বাসিত সূর্যের চোখ;
বাতাস ছুঁলেই ডাল থেকে ঝরে পড়ে অচেনা ঋতু,
পাতারা মাটিতে শুয়ে শোনে পৃথিবীর গোপন শোক।

একটি পারসিমন কাটতেই ছুরি থেকে ঝরে পড়ে নভেম্বর,
রক্তের বদলে টেবিলে ছড়িয়ে পড়ে কুয়াশার বীজ;
ঘরের দেয়ালে জন্ম নেয় পাতাহীন এক বন,
তার প্রতিটি গাছে ঝোলে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনলিপি।

ফলের ত্বকে লেখা আছে সময়ের অদৃশ্য বর্ণমালা,
জিহ্বা ছুঁতেই মুখের ভেতর খুলে যায় তিক্ততার দরজা;
আমি দেখি, এক বৃদ্ধ ঋতু নিজের ছায়া খাচ্ছে,
আর তার চোখে মিষ্টি হয়ে উঠছে পৃথিবীর সমস্ত শূন্যতা।

জাপানের এক উঠোনে দড়িতে ঝুলছে কয়েকটি শুকনো চাঁদ,
রোদ তাদের শিরায় ঢেলে দেয় বিলুপ্ত নদীর জল;
হোশিগাকির ভাঁজে ভাঁজে আটকে থাকে বিদায়ী শরৎ,
শীত এসে তাদের গন্ধে খুঁজে ফেরে নিজের জন্মকাল।

একটি বীজ আমার হাতের রেখা বেয়ে নেমে যায় মাটির নিচে,
সেখানে অন্ধকারেরও আছে নিজস্ব ঋতুচক্র;
শিকড়েরা উল্টো দিকে হাঁটে—পৃথিবীর কেন্দ্র ছেড়ে
ফিরে যায় সেই গাছে, যেখানে সময় এখনো কাঁচা ফল।

রাতে আমার জানালায় কে রেখে যায় কমলা অমাবস্যা?
আমি ছুঁতে গেলে আঙুলে লেগে থাকে দূরদেশের ধুলো;
এক কামড়ে দেখি—আমার শৈশব একটি পাকা পারসিমন,
তার ভেতর বসে আছে ভবিষ্যৎ, মুখে আমারই মুখ।

ভোর হলে বাগানে কোনো ফল থাকে না, কোনো গাছও নয়,
শুধু মাটির ওপর পড়ে থাকে একটি গোলাকার ছায়া;
আমি তাকে তুলতে গিয়ে দেখি—আমার হাতের মুঠোয়
একটি নতুন শরৎ, অথচ পৃথিবীতে তখন বসন্তের মায়া।

পাদটীকা: পারসিমন জাপানের শরৎকালীন এক মিষ্টি ফল। হোশিগাকি হলো জাপানি ঐতিহ্যে শুকনো পারসিমন। কবিতায় ফলটি শরৎ, সময়, স্মৃতি ও অস্তিত্বের এক পরাবাস্তব প্রতীক। কবিতায় তার সঙ্গে যুক্ত দৃশ্যগুলো কল্পনানির্ভর।

No comments:

Post a Comment