পরাবাস্তব কবিতা: হিমালয়ের রহস্য - শাহাদাতুর রহমান সোহেল


হিমালয়ের রহস্য
- শাহাদাতুর রহমান সোহেল

ভোর হলে হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো কুয়াশায় মুখ লুকায়,
বরফের গায়ে প্রথম আলো—কোনো পুরোনো চিঠির মতো।
পাহাড় বেয়ে নেমে আসে সরু, স্বচ্ছ এক নদী,
তার জলে কেঁপে ওঠে বহু আগে হারিয়ে যাওয়া সমুদ্রের স্মৃতি।

এভারেস্টের শিলায় আজও সামুদ্রিক জীবের জীবাশ্ম,
পাথরের গায়ে আটকে আছে এক বিলুপ্ত নীল দিনের চিহ্ন।
যেখানে এখন মেঘ এসে পাহাড়ের কপালে বসে,
সেখানে একদিন ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিত পৃথিবীর মুখ।

রাত নামলে গিরিখাতের ছায়া দীর্ঘ হয়ে আসে,
বরফের ওপর কারা যেন রেখে যায় অচেনা পায়ের ছাপ।
ভোরের আলোয় তাদের খুঁজতে গিয়ে দেখি—
ছাপগুলো মিলিয়ে গেছে, শুধু কুয়াশায় ভাসে এক জোড়া চোখ।

রূপকুণ্ডের জলে কঙ্কালগুলো নীরবে শুয়ে থাকে,
চাঁদের আলো তাদের হাড়ে এঁকে দেয় হারানো পথের রেখা।
মনে হয়, তারা এখনো কোনো দূরের জনপদের দিকে যাচ্ছে,
কিন্তু হ্রদের জল প্রতিটি পদক্ষেপ ফিরিয়ে দেয় অতীতে।

পাহাড়ের গায়ে প্রাচীন গুহা, দেয়ালে অস্পষ্ট হাতের ছাপ,
কোনো মানুষ একদিন এখানে অন্ধকারের সঙ্গে কথা বলেছিল।
আজ বাতাস সেই হাতের ওপর আঙুল বুলিয়ে যায়,
আর পাথরের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসে বহু পুরোনো নিঃশ্বাস।

তুষারঢাকা বনে ইয়েতির গল্প ছড়িয়ে থাকে,
বরফে দেখা অচেনা পদচিহ্ন সন্ধ্যার সঙ্গে হারিয়ে যায়।
আমি ভাবি, অজানাকে আমরা কত সহজে প্রাণীর নাম দিই—
তারপর সেই নামের ভেতরেই লুকিয়ে রাখি নিজেদের ভয়।

হিমবাহের নিচে নদী বয়ে চলে অন্ধকারে,
তার জলে ভাঙা আকাশের টুকরো ধীরে ধীরে সরে যায়।
কোনো পাথর ছুঁলে মনে হয়, তার ভেতরে ঢেউ জেগেছে—
যেন সমুদ্র এখনো ভুলতে পারেনি তার হারানো ঠিকানা।

কৈলাসের দূরবর্তী শৃঙ্গে মেঘ জমে থাকে নিঃশব্দে,
সন্ধ্যার আলো পাহাড়ের গায়ে টেনে দেয় দীর্ঘ ছায়া।
দেখতে দেখতে মনে হয়, ওই ছায়ার ওপারে
কেউ একটি দরজা খুলেছে—কিন্তু কাউকে ডাকেনি।

হিমালয়, তোমার রহস্য কি শুধু বরফ আর পাথরে?
নাকি মানুষের অজানা ইতিহাস জমে আছে তোমার নীরবতায়?
তোমার শিখরে দাঁড়িয়ে মেঘেরা দূরের সমুদ্র খোঁজে,
আর আমি শুনি পাথরের ভেতর থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের শব্দ।

রাত শেষে সূর্য ওঠে, বরফে ছড়িয়ে পড়ে সোনালি আলো,
পায়ের নিচে জমে থাকা তুষার আবার গলে নদী হয়।
সুউচ্চ পর্বত নদী হয়ে দুরন্ত ছুটে চলে দূর পথ —
সমুদ্র স্মৃতির খোঁজে অবশেষে পৌঁছে সাগরে পলি নিয়ে। 



পাদটীকা: কবিতাটিতে হিমালয়ের সামুদ্রিক জীবাশ্ম, রূপকুণ্ডের কঙ্কাল, হিমবাহ, প্রাচীন গুহা ও ইয়েতির লোককথার মতো বাস্তব ও লোকবিশ্বাসনির্ভর অনুষঙ্গ ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তবের পরিচিত দৃশ্যের ভেতর দিয়েই পুরো কবিতায় নানাভাবে পরাবাস্তবতার আবহ নির্মিত হয়েছে। প্রকৃতির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, মানুষের অজানা অতীত ও রহস্যবোধ এখানে মিলেমিশে একাকার হয়েছে—যেখানে হারিয়ে যাওয়া সমুদ্র কেবল স্মৃতি নয়, যেন এক জীবন্ত সত্তা, যে আজও পাহাড়ের বুক চিরে নিজের ঠিকানা খুঁজে ফেরে।

No comments:

Post a Comment