একজোড়া দৃষ্টির মহাকাব্য - শাহাদাতুর রহমান সোহেল eyes

একজোড়া দৃষ্টির মহাকাব্য
- শাহাদাতুর রহমান সোহেল

স্মৃতিরা আজও পুরোনো দেয়ালে ঝুলে থাকা বিবর্ণ আলোকচিত্রের 
ভেতর নিজেদের জন্য একটি নিরাপদ শীতকাল খুঁজে বেড়ায়,
আর আমি দেখেছি—
সময়ের কাচঘেরা জাদুঘরে সংরক্ষিত কোনো মুখ নয় তুমি,
বরং নক্ষত্রমালার অন্তরালে জেগে থাকা এমন এক আদি আলোককণা,
যার জন্মের সংবাদ এখনো পৌঁছায়নি পৃথিবীর কোনো ভাষায়;
কারণ বর্তমানের অস্থির নদীকে তারা কখনোই সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে শেখেনি।
একদিন গোধূলি তার রক্তিম শিরা ছড়িয়ে দিয়েছিল আকাশের বিস্মৃত মানচিত্রে,
আর আমাদের মাঝখানে খুলে গিয়েছিল এক স্বচ্ছ মহাশূন্য—
যেখানে শব্দগুলো ধূমকেতুর মতো দগ্ধ হচ্ছিল,
আর নীরবতাগুলো জন্ম দিচ্ছিল নতুন নতুন নক্ষত্রপুঞ্জের।

আমি তখন তোমার দিকে তাকিয়ে ছিলাম,
যেমন কোনো প্রাচীন জ্যোতির্বিদ তাকিয়ে থাকে অচেনা এক নীলাভ গ্রহের দিকে,
যার কক্ষপথের গোপন সমীকরণ সে কখনো সমাধান করতে পারবে না জেনেও;
কারণ রহস্যেরও তো একটি পবিত্রতা আছে,
যা উন্মোচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে।

তুমি ছিলে না কোনো মানুষ,
ছিলে না কোনো সম্পর্কের অভিধানিক সংজ্ঞা,
ছিলে না সামাজিক উচ্চারণের জন্য নির্মিত কোনো পরিচয়ের শিলালিপি—
তুমি ছিলে ঘুমন্ত বীজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বনের পূর্বাভাস,
সমুদ্রের গভীরে নিভে যাওয়া সূর্যের শেষ স্বর্ণাভ কম্পন,
অথবা বহু সহস্রাব্দ ধরে মহাবিশ্বের অন্ধকারে ভেসে চলা
এক অনামা আলোকযানের নীরব যাত্রা।

আমি তোমাকে স্পর্শ করতে চাইনি,
কারণ স্পর্শেরও এক ধরনের ক্ষয় আছে;
যেমন হাতে ধরা তুষার ধীরে ধীরে জল হয়ে যায়,
যেমন মুঠোবন্দি প্রজাপতি তার রঙ হারায়,
যেমন উচ্চারিত হওয়ার পর কিছু শব্দ আর কখনো আগের মতো পবিত্র থাকে না।

তাই তোমাকে রেখে দিয়েছিলাম দূরত্বের ভেতরে,
যেখানে তুমি নিজের মাধ্যাকর্ষণে আবর্তিত এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নক্ষত্র,
আর আমি—
অনন্তের কিনারায় বসে থাকা এক ক্ষণস্থায়ী পর্যবেক্ষক,
যার সমস্ত দর্শন, সমস্ত কবিতা, সমস্ত ব্যর্থ জ্ঞান
একটি মাত্র দৃষ্টিবিন্দুর সামনে এসে নিঃশব্দে নতজানু হয়ে পড়ে।

এরপর বহু ঋতু পৃথিবীর ক্যালেন্ডার থেকে খসে পড়েছে মৃত পাতার মতো,
বহু নগরী ভেঙে গেছে মানুষের বিস্মৃতির ভেতর,
বহু নদী তাদের পুরোনো নাম হারিয়ে ফেলেছে;
কিন্তু সময়ের গভীরতম স্তরে এখনো একটি মুহূর্ত অবিকল জেগে আছে—
যেন অ্যাম্বারের ভেতর আটকে থাকা লক্ষবর্ষ পুরোনো কোনো আলোকরেণু,
যেন সৃষ্টির প্রথম প্রহরে উচ্চারিত কোনো গোপন শব্দ,
যার প্রতিধ্বনি এখনো মহাকাশের অদৃশ্য দেয়ালে ঘুরে বেড়ায়।

সেখানে তুমি নেই,
আবার আছও;
সেখানে আমিও কোনো নির্দিষ্ট সত্তা নই,
শুধু এক বিস্ময়বাহী চেতনার ক্ষুদ্র কম্পন;
আর সমগ্র মহাবিশ্ব—
তার সমস্ত নীহারিকা, কৃষ্ণগহ্বর, জন্ম ও বিনাশের ইতিহাসসহ—
এক দীর্ঘ, নিঃশব্দ, আড়ালহীন দৃষ্টির ভেতর
ধ্রুবতারার মতো স্থির হয়ে থাকে।

তখন বুঝি,
মহাকাব্য আসলে দীর্ঘ কাহিনি নয়—
মহাকাব্য সেই একক মুহূর্ত,
যেখানে অনন্তকাল এসে আশ্রয় নেয়
একজোড়া দৃষ্টির গভীরে।

No comments:

Post a Comment