
বির তাওইল: পৃথিবীর অনাথ ভূখণ্ড
— শাহাদাতুর রহমান সোহেল
দুই দেশের মাঝখানে এক টুকরো নীরবতা,
মানচিত্রে যার নাম আছে—
কোনো ঠিকানা নেই।
মিশর তাকে ঠেলে দেয় সুদানের দিকে,
সুদান সরিয়ে রাখে মিশরের ছায়ায়—
মাঝখানে বালিরা হয়ে ওঠে
পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ নাগরিক।
এখানে সীমান্তের কাঁটাতার নেই,
তবু অদৃশ্য দেয়ালে আটকে থাকে বাতাস;
শুকনো কূপের তলায় চাঁদ নেমে এসে
জল নয়, নিজের মুখ খোঁজে।
পাহাড়ের বুকে ঘুমিয়ে থাকে
একটি অনাদৃত দেশের অসমাপ্ত সংবিধান।
কোনো এক অভিযাত্রী আসে—
বালুর বুকে পুঁতে দেয় স্বপ্নের পতাকা;
দিগন্তে মুহূর্তের জন্য জ্বলে ওঠে
রাজমুকুটের মতো একটি সূর্য।
কিন্তু নক্ষত্রেরা জানে,
পতাকা তুললেই দেশ জন্মায় না—
স্বপ্নেরও লাগে পৃথিবীর স্বীকৃতি।
রাত হলে মরুভূমি নিজের কাছে ফেরে,
বাতাস মুছে দেয় সমস্ত পদচিহ্ন;
শুধু বালির নিচে চাপা পড়ে থাকে
ঔপনিবেশিক মানচিত্রের দুটি পুরোনো ক্ষত।
ইতিহাস ঘুমায় না—
সে মাঝরাতে সীমান্ত বদলে
মানুষের ভাগ্যে লিখে যায় বিস্ময়চিহ্ন।
হে বির তাওইল,
তুমি কি তবে প্রত্যাখ্যাত পৃথিবীর শেষ আশ্রয়?
নাকি দুই দেশের অহংকারের মাঝখানে
পড়ে থাকা এক মুঠো আয়না—
যেখানে রাষ্ট্রেরা নিজেদের মুখ দেখে,
অথচ তোমার চোখে চোখ রাখতে পারে না?
তোমার কোনো স্বীকৃত পতাকা নেই,
তবু তোমার আকাশ কারও দখলে নয়;
তোমার কোনো রাজা নেই,
তবু তোমার নীরবতা সিংহাসনের চেয়ে গভীর।
পৃথিবী ভাগ হতে হতে একদিন
যখন নিজের জন্যও জায়গা পাবে না,
তখন হয়তো ফিরে আসবে তোমার কাছে—
এক মুঠো বালি হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করবে,
“যে ভূমিকে কেউ নিজের বলে মানেনি,
সেই ভূমিই কি তবে
পৃথিবীকে শিখিয়ে দেবে—
অধিকার আর আপন হওয়া এক কথা নয়?”
পাদটীকা ও কবিতার প্রেক্ষাপট:
বির তাওইল (Bir Tawil) মিশর ও সুদানের মধ্যবর্তী একটি শুষ্ক মরুভূমি অঞ্চল, যার আয়তন প্রায় ২,০৬০ বর্গকিলোমিটার। ১৮৯৯ সালের সীমান্তরেখা ও ১৯০২ সালের প্রশাসনিক সীমারেখার পার্থক্যের কারণে অঞ্চলটি দুই দেশের সীমান্তবিরোধের এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে। মিশর ও সুদান হালাইব ত্রিভুজের ওপর পরস্পরবিরোধী দাবি বজায় রাখলেও বির তাওইলকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে না। এই কবিতায় বির তাওইল কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সীমানা, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, মালিকানাবোধ, স্বীকৃতির রাজনীতি এবং মানুষের অস্তিত্বসংকটের প্রতীক।
দ্রষ্টব্য: কবিতার চিত্রকল্প ও দার্শনিক বক্তব্য কাব্যিক কল্পনার অংশ; এগুলোকে আক্ষরিক ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে পড়ার জন্য নয়।
No comments:
Post a Comment