শূন্যতার স্থাপত্য
– শাহাদাতুর রহমান সোহেল
– শাহাদাতুর রহমান সোহেল
তোমার অনুপস্থিতির মহাকর্ষে—
একটি অবাধ্য সূর্যোদয় সারারাত বসে রইল দিগন্ত-কিনারায়,
সোনালি ডানায় জমল স্থবির কুয়াশার শিশির;
তবু পৃথিবীর কপালে আঁকল না সে
আলোর প্রথম জ্যামিতিক স্বাক্ষর।
তোমার অনুপস্থিতির দীর্ঘ ছায়ায়
এক প্রাচীন নদী ভুলে গেল তার মোহনার আদিম ঠিকানা,
স্রোতেরা উজানমুখী হতে চাইল উৎসের দিকে;
যেন বহমানতার চেয়ে
এই প্রত্যাবর্তনই অধিক সত্য।
মহাফেজখানার অন্ধকারে
এক শতাব্দীপ্রাচীন পাণ্ডুলিপি তার শেষ অমোঘ বাক্যটি
লিখতে অস্বীকার করে রুদ্ধ করল নিজেকে;
হলুদ পাতার ভাঁজে আটকে রইল
এক অসমাপ্ত উপাখ্যানের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার চরম শূন্যতায়—
হিমবাহের গহীন জঠরে সুপ্ত নীল অগ্নিস্তূপ
আর জাগল না;
উত্তর মেরুর হিমেল বাতাস
নিজেরই পদচিহ্ন ধরে ফিরে গেল বরফের আদিম গুহায়।
আমি দেখলাম—
আকাশের কৃষ্ণমঞ্চে তারকারা বুনে চলেছে আলোর সুতোয় রাত্রির চাদর,
হঠাৎ একটি তন্তু ছিঁড়ে গেলে থমকে দাঁড়াল নক্ষত্রবীথি;
যেন এই অনন্ত মহাবিশ্ব ভুলে গেছে
তার নিজস্ব আদি উচ্চারণ।
তোমার অনুপস্থিতির মহাকর্ষে—
মঙ্গলের কক্ষপথে স্তব্ধ হয়ে গেল নিঃসঙ্গ এক মহাকাশযান;
মানবের সমস্ত দূরগামী ভবিষ্যৎ
ধীরে ধীরে পিছু হটে ফিরে এলো
গুহাচিত্রে খোদাই করা প্রথম আগুনের আদিমতার কাছে।
দূর কোনো ছায়াপথের সীমান্তে
এক কৃষ্ণগহ্বর নিজের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা ভুলে তাকিয়ে রইল মহাশূন্যে,
যেন সেও জেনে গেছে—
মহাবিশ্বের সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু
আইনস্টাইনের মহাকর্ষ নয়।
তোমাকে ছাড়া—
বাতাস তার বাঁশিটি নামিয়ে রেখেছে লোহিত ধূলিতে,
শ্রাবণ ভুলেছে জানালায় টোকা দেওয়ার চেনা ব্যাকরণ,
আর গোধূলি পশ্চিম-আকাশে রক্তিম ওড়না মেলে অপেক্ষা করতে করতে
বিবর্ণ করে ফেলেছে নিজের সমস্ত অহংকার।
সমুদ্র গুটিয়ে নিয়েছে তার উদ্বেল তরঙ্গ,
পরিযায়ী পাখিরা হারিয়েছে বিষুবরেখার স্মৃতি,
মহাকালও খুলে রেখেছে তার ঘড়ির কাঁটা—
কোনো এক পরিত্যক্ত মৃত নক্ষত্রের পাশে।
আর আমি—
এক ভগ্ন, পরিত্যক্ত মানমন্দির;
যার সমস্ত দূরবীক্ষণ স্তব্ধ হয়ে আছে একটিমাত্র অনুপস্থিত বিন্দুর দিকে,
যার আলো আজও এসে পৌঁছায়নি
আমার এই সুদীর্ঘ রাত্রিতে।
কারণ,
তোমার এই না-থাকা কোনো ব্যক্তিগত ক্ষরণ নয়,
নয় কোনো একাকী বিকেলের অলস দীর্ঘশ্বাস;
এ যেন—
সৃষ্টিকর্তা ক্যানভাস মেলেছেন, রং সাজিয়েছেন, আলো জ্বেলেছেন,
ডেকেছেন অনন্ত সময়কে;
কিন্তু সৃষ্টির প্রথম তুলির আঁচড়টি
আজও পড়েনি।
তাই আমার মহাবিশ্ব জুড়ে এখনো ভেসে বেড়ায়
নক্ষত্রজন্মের আগের সেই নীরবতা—
যেখানে তোমার অনুপস্থিতিই একমাত্র দৃশ্যমান সত্য:
এই বেদনার্ত শূন্যতাতেই সৃষ্টি মহান শিল্প-স্থাপত্য।
No comments:
Post a Comment